বৃহস্পতিবার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৪ ১৪২৬   ১৯ মুহররম ১৪৪১

৩৩২

আ’লীগ ও বিএনপির মিল-অমিল

প্রকাশিত: ৫ ডিসেম্বর ২০১৮  

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে মিল-অমিল নিয়ে কিছু কথা আগেই বলেছি আমি নিজেকে একজন রাজনীতি সচেতন নাগরিক বলে মনেকরি। দীর্ঘসময় আমি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলাম। এখনো নিজেকে রাজনীতির বাইরে ভাবি না। প্রতিদিন বেশ কয়টি সংবাদপত্র পাঠ করি। দেশ নিয়ে ভাবি, পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করি। এটা স্বীকার করতেই হয়, আমাদের দেশে যারা রাজনৈতিক কলাম লেখেন, যারা টকশোতে কথা বলেন, তারা সমস্যার গভীরে না গিয়ে হালকা চালে এমন সব কথা লেখেন বা বলেন, যা সাধারণ মানুষের চিন্তাজগতকে সমৃদ্ধ না করে বিভ্রান্ত করে।

যাদের বিশিষ্ট ভাবা হয়, যাদের কাছে মানুষ ‘আলো’ প্রত্যাশা করে, তারা প্রায়ই চটুল কথা বলে বা লিখে বাহবা কুড়াতে চান। সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন হুজুগপ্রিয়তা আছে, তেমনি বিশিষ্ট জনেরাও এ প্রবণতা থেকে মুক্ত নন। ফলে পক্ষপাতহীন আলোচনা কিংবা লেখালেখি খুব একটা দেখা যায় না।


ইদানীং টকশো এবং লেখালেখিতে অনেকেই বলেন যে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির কোনো পার্থক্য নাই। যদিও আমি সাদা চোখে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতি দেখে এটা বুঝি যে, এই দুই দলের মধ্যে আদর্শগত বিরাট পার্থক্য আছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে মিলঅমিল নিয়ে একটা লেখা পড়েছিলাম। প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসার লেখাটি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ইতিহাস ও রাজনীতি সম্পর্কে জানতে খুবই সহায়ক মনে করে লেখাটি তুলে ধরতে চাই। ‘আওয়ামী লীগের জন্ম অবশ্যই গণতান্ত্রিক ধারায় ঘটেছে। তৎকালীন স্বৈরতান্ত্রিক মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে, তাদের অপশাসনের অবসান ঘটাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একটি গণজাগরণ সৃষ্টি করেছিল আওয়ামী লীগ। আচম্বিতে অথবা কোনো কলকাঠি নেড়ে এ-দল ও-দল ভাঙিয়ে নীতিআদর্শহীন রাজনীতিচর্চাকারীদের সমন্বয়ে দলটির জন্ম হয়নি, যেমনটি হয়েছিল বিএনপির। যাঁরা এককালে মুসলিম লীগে ছিলেন, প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির মোহভঙ্গের পর আওয়ামী মানে জনগণের, মধ্যপন্থী প্রগতিশীল আদর্শের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভিত্তি স্থাপন করেন। অন্যদিকে বিএনপি, তার আদিরূপ ‘জাগদল’ অগণতান্ত্রিক পন্থায় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সৃষ্টি। একথা ঠিক যে, ক্যান্টনমেন্টে বিএনপি ও তার পূর্বসূরি ‘জাগদলে’র জন্ম হয়নি। কারণ, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা তখন অবৈধভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে এসে গেছেন, জগদ্দল পাথরের মতো জনগণের কাঁধে সওয়ার হয়েছেন। জেনারেল নূরুল ইসলাম শিশু, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান মেজর জেনারেল মহব্বতজান চৌধুরী ও তাঁদের সহায়তাকারী আমলা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সালাহউদ্দিন আহমদ আদর্শচ্যুত, সুবিধাবাদী, রাজনীতিবিদদের সমন্বয়ে ‘জাগদল’ গঠন করেছিলেন। একসময় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক পোশাকটি ছাড়লেও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেননি, সাফারি-স্যুট পরে সিভিলিয়ানের ভেক ধরেছেন। তার সিভিলিয়ান কাম মিলিটারি মনোনীত পরামর্শক ও মন্ত্রীদের মধ্যে ছিলেন কার্যরত ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আর তাদের উচ্ছিষ্টভোগী রাজনীতিক। উভয় শ্রেণির অনেকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন।

বিএনপি গঠন করে জেনারেল জিয়াউর রহমান ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ নয়, বহির্বিশ্বকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য একটি ‘মাল্টি-পার্টি’ তথা আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে সাজানো নির্বাচনে অংশগ্রহণে প্ররোচিত করে, রাজনীতি করার সীমিত সুযোগ দিয়ে ‘বহুদলীয় সংসদ’ গঠন করেছিলেন। এ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি গণতন্ত্রের প্রতি মায়ার কারণে নয়, বহির্বিশ্বে তাঁর সরকারকে গ্রহণযোগ্য করতে। এর আগে একটি প্রহসনের গণভোটে (হ্যাঁ/না ভোটে) তিনি ১১০ ভাগ ভোট আদায় করেছিলেন!

এখন সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়েরূপান্তরের ইতিহাস। আওয়ামী লীগ থেকে আমার অতি শ্রদ্ধেয়, ব্যক্তিগতভাবে আমি যাঁর স্নেহভাজন ছিলাম, মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে মতদ্বৈধতা প্রকাশ করে কাগমারি সম্মেলনের পর আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন, ত্যাজ্য করেননি। আদর্শ, নীতি, বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস,  অসাম্প্রদায়িকতা-গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দুই দলের মধ্যে ৯৯ শতাংশ মিল ছিল।

জিয়াউর রহমান এসবের সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পাকিস্তান আমলের ভাবধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে ধর্মান্ধতাকে পুঁজি, সাম্প্রদায়িকতার বীজ লালন করে একটি রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়া তৈরি করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ও শহীদ জিয়াউর রহমানসহ অগণিত মুক্তিযোদ্ধার হত্যাকারী কারা?

‘কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল’ সেনাসদস্যের অপকর্ম বলে কি সমগ্র সেনাবাহিনীকে দায়মুক্ত করা যাবে? উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু জিয়াউর রহমানের প্রকৃত হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে বর্তমানের বিএনপি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

মিল-গরমিলের তুলনায় আওয়ামী লীগ দল ও সরকারের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, সেই আলোচনায় অনেক তথ্য ও সত্য বিবেচনায় আনতে হবে।


মুক্তিযুদ্ধে অবশ্যই জিয়াউর রহমানের অবদান রয়েছে। সেই অবদানটি যুদ্ধক্ষেত্রে, দুই দশকের মুক্তি আন্দোলনে নয়। মুক্তি আন্দোলনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ও অংশগ্রহণে দুই দশকের চরম পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি যে দলটি প্রতিষ্ঠা করেছেন, তার কোনো অবদান ছিল না।

বায়ান্ন, বাষট্টি ও ঊনসত্তর পেরিয়ে আমরা একাত্তরে পৌঁছেছি। সেই ক্রমবিকাশেই বাঙালি অনেক ত্যাগের মাধ্যমে ধাপে ধাপে স্বাধীনতার পথে এগিয়েছে। ড্রামের ওপর দাঁড়িয়ে শিঙা ফুঁকে কেউ স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনা করেননি। সেসব ধাপ তৈরিতে জেনারেল জিয়া অথবা বিএনপির কোনো অবদান নেই।

আমার সর্বশেষ বক্তব্য হচ্ছে, এখন অতীত নিয়ে বর্তমানের দুই দলের  অবস্থান নির্ণয় করা অথবা তুলনামূলক আলোচনা অর্থহীন। আওয়ামী লীগ সরকার যা-ই করুক, আওয়ামী লীগ দলটি তার ত্যাগী, সাত দশকের গভীরে প্রোথিত শিকড়ের কারণে তৃণমূল কর্মীরা দলের দুর্দিনেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অটল থাকেন। তারা সবাই ‘তালেবান’ মানে বঙ্গবন্ধুর নামে, তাঁর কন্যার প্রতি ভালোবাসা ও প্রশ্নোর্ধ্ব আনুগত্যের কারণে সুসময়ে-দুঃসময়ে  সমানতালে নাচতে থাকেন। সুযোগসন্ধানী নব্য আওয়ামী লীগাররা হলো ‘ফলেবান’ মানে দল ক্ষমতায় এলে ফল ভোগ করে। অন্যদিকে বিএনপির অবস্থা হচ্ছে, ক্ষমতায় গেলে বীরত্বের সঙ্গে বাগেরহাট-ভোলায় তা-ব করে।

কেমন তা-ব তা বোঝাতে সেই আর্তনাদটি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। ভোলা, নাকি বাগেরহাটে এক মায়ের সেই আর্তনাদ: ‘বাবারা! আমার মেয়ে ছোট, তোমরা একজন-একজন করে আইসো।’ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ক্ষমতা হারালে সংঘবদ্ধ হয়, বিএনপি হয় বিপর্যস্ত-ছত্রভঙ্গ। এটি হলো দুই দলের ক্ষমতাধর ও ক্ষমতাহীন অবস্থায় গরমিল চেহারা (বিএনপি আওয়ামী লীগে কিছু মিল অনেক গরমিল, এবিএম মূসা, প্রথম আলো, ৫ মে ২০১১)।’ জনাব মূসার এই দীর্ঘ উদ্ধৃতিটি ব্যবহার করার কারণ তিনি একজন দলনিরপেক্ষ, নির্ভীক, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য দেশপ্রেমিক সাংবাদিক।

এরপরও যারা মনে করেন, আওয়ামী লীগ বিএনপির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, তাদের জন্মান্ধ কিংবা জ্ঞানপাপী ছাড়া আর কিছু বলা যায় কি?

আজকের নড়াইল
আজকের নড়াইল
এই বিভাগের আরো খবর